কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হালচিত্র

হালিম সৈকত,কুমিল্লা ।। রোহিঙ্গদের অবর্ণনীয় দুঃখ, দুর্দশা দেখতে এবং মানবিক সাহায্য করার লক্ষ্যে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ খ্রি. আমরা রওয়ানা হয়েছিলাম কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার কুতুপালং এবং বালুখালী শরণার্র্র্থী ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।

কক্সবাজার থেকে উখিয়ার পথে ঢুকতেই চোখে পড়ে ত্রাণবাহী গাড়ির সারি। উদ্দেশ্য একটাই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়ত্বের চিত্র নিজ চোখে দেখা এবং সাধ্যমত সহযোগিতা করা। আমাদের ফ্রেন্ডস ক্লাব এবং আশার আলো সমবায় সমিতির ডাকে

সাড়া দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রবাসী বন্ধুরা, মাছিমপুর গ্রামবাসী, পরিচিত আপনজনসহ নানা শ্রেণি পেশার

মানুষজন। সকলের সহযোগিতার কারণেই আমরা বিপুল জন¯্রােতের সামান্য কিছু লোকজনকে ত্রাণ এবং নগদ অর্থ সহযোগিতা করতে পেরেছি।

আমরা কুতুপালং এবং বালুখালী ক্যাম্পে আশি হাজার নগদ টাকা বিতরণ করেছি। প্রত্যেক পরিবারকে ২০০-২৫০ টাকা করে প্রদান করেছি। নিজ হাতে দিতে পেরেছি বলে অনেক আনন্দ পেয়েছি। আর আমরা যেসব জায়গায় সহায়তা করেছি সেসব জায়গায় কেউ সাধারণত যায় না। রাস্তা থেকে ত্রাণ দিয়ে চলে যায়, ফলে কেউ পায় কেউ পায় না। আবার কোন কোন পরিবার কয়েকবার ত্রাণ পেলেও, কোন কোন পরিবার একবারও পায় না। তার কারণ গর্ভবতী মহিলা, বুড়ো, যুবতী মেয়েরা (লজ্জায়) সাধারণত এত উচু পাহাড় বেয়ে ত্রাণ নিতে নিচে আসতে পারে না।আবার কোন কোন পরিবারে পুরুষ নেই সাথে, যে ত্রাণ নিতে আসবে?

 

প্রতিদিন রাস্তার দু’ধারে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো দিয়ে ব্যাগ বোঁচকা নিয়ে লাইন দিয়ে হাটছে (রোহিঙ্গারা) এটা এখন টেকনাফ বাসীর চেনা দৃশ্য। আগস্ট মাসের ২৫ তারিখ থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের উপর যে হত্যাযজ্ঞ, বাড়িঘর পুড়িয়ে বিতাড়ন করছে তা এখনো চলছে বলে জানিয়েছেন ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গারা।

ঘর-বাড়ি হারা, দেশ থেকে উখাত হওয়া হাজার হাজার শিশু, নারী, জোয়ান, বৃদ্ধ প্রাণ বাঁচাতে প্রায় একরকম শূন্য হাতেই জেলে নৌকায় বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে আসছেন। সেখান থেকে তাদেরকে নেওয়া হচ্ছে টেকনাফ ও উখিয়ার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে।

ইতোমধ্যে নতুন পুরাতন মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের মতে এদের ৬০ শতাংশই শিশু। এই বিপুল পরিমাণ জন¯্রােতে সামাল দেওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি বাংলাদেশের প্রশাসনের ছিল না বলেই মনে হয়েছে। অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকা এই বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীর আবাসন,খাদ্য, সুপেয় পানি,  স্যানিটেশন ও চিকিসা এসব মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের ব্যবস্থা করার যথেষ্ট সময় ও সুযোগ কোনটিই প্রশাসনের ছিল না বলেই মনে হয়েছে।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে থাকা লোকজন বেশ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। আশ্রয় শিবির ঘুরে দেখা গেছে হাজার হাজার আশ্রিত রোহিঙ্গারা সর্দি, জ¦র, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।

কুতুপালং ও বালুখালী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা গেছে প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ রোগে ভুগছে। আরাকান থেকে পালিয়ে আসতে ১২ থেকে ১৩ দিন সময় লেগেছে কারও কারও আবার নূূ্যূনতম তিন দিন লেগেছে কারো কারো। মিয়ানমার

থেকে এই দীর্ঘ সময় তারা অনাহারে অর্ধাহারে পায়ে ঁেহটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। অতপর বাংলাদেশে মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে দুই তিন দিন পেরিয়ে গেছে। এখানে প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টিতে ভিজে তারা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

টেকনাফ ও উখিয়ায় কোনো নতুন আশ্রয়কেন্দ্রেই বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে অনেকে পাহাড়ি ছড়ার অনিরাপদ ঘোলা পানি খাওয়া ও রান্নার কাজে ব্যবহার করছেন।

গর্ভবতী মহিলা রয়েছে সেখানে প্রচুর। তবে একটি বিষয় খুবই ভালো লেগেছে প্রতিটি গর্ভবতী তাঁবুতে হলুদ নিশান উড়িয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিছু পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায় সেনাবাহিনী এবং মগদের অত্যাচারেই তারা তাদের প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে পরবাসী হতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিদিনই ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে, মহিলাদের ধর্ষন করছে,কাউকে কাউকে হত্যা করছে। বিশেষ করে মগদের নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরেই তারা শরণার্থী হয়েছেন বলে জানান অনেকে।

বর্তমানে ক্যাম্পগুলোতে যে সকল সমস্যা রয়েছে সেগুলো হলো তীব্র সুপেয় পানি সংকট, জরুরী ঔষধপত্রের সংকট, স্যানিটেশন সমস্যা ও ত্রাণের সুষ্ঠ বন্টনের অভাব। আবার রোহিঙ্গাদের ঘিরে তৈরি হয়েছে এক শ্রেণির দালালচক্র। তাদেরকে বলা হয় মাঝি। তারা টোকেন দিচ্ছে আর প্রতি পরিবার থেকে নিচ্ছে ৫০ টাকা করে। তাঁবু তৈরির জন্য বাঁশ

আর পলিথিনের দাম সেখানে আকাশচুম্বী। প্রতিদিনই হাজার হাজার ত্রাণবাহী গাড়ি আসছে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে কিন্তু ত্রাণগুলো বন্টন হচ্ছে না সুষ্ঠভাবে। যে যার মতো করে দিয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ গাড়ি থেকে ছিটিয়ে ছিটিয়ে ত্রাণ ছুঁড়ে মারছে আর সেগুলো নিয়ে মারামারি করেেছ অভাবগ্রস্থ পরিবারগুলোর সদস্যরা। রোহিঙ্গাদের নেই কোন নিরাপত্তা আর এত সব রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা প্রদান করা সম্ভবও না হঠা করে। পয়ঃনিষ্কানের ব্যবস্থা না থাকায় পরিবেশ বিপর্যয়ের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং ইতোমধ্যে একটি দূষিত গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

 

একটি বিষয় বেশ অবাক লেগেছে প্রতিটি পরিবারের লোক সংখ্যা ৭- ১২ জন। বার্মায় কি জন্ম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না? তবে একটি বিষয় বেশ উদ্বেগের তারা খুব সহজেই ছড়িয়ে যাচ্ছে এবং বাঙ্গালিদের সাথে মিশে বিয়ের পিড়িতে বসছে। পূূূর্বে  অনেকে বাঙ্গালি পরিচয়ে পাসপোর্ট করে বিদেশে গিয়ে নানা অপকর্ম করে বাংলাদেশের অনেক ক্ষতি করেছে। আবার কারো কারো বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদেও জড়িয়ে পরার অভিযোগ উঠছে! যেখানে ভারতের মত দেশ তাদের আশ্রয় দিতে উন্ঠা প্রকাশ করছে সেখানে বাংলাদেশে কেন আশ্রয় দিচ্ছে? বিষয়টি মানবিক তাই। তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য বিরাট সমস্যার কারণ হয়ে উঠবে তাতে কোন সন্দেহ নাই।

যদি অচিরেই অং সান সূচির সরকারের সাথে বিষয়টির সুরাহা না হয়। আমারা যারা সহায়তা নিয়ে গিয়েছিলাম তারা হলেন আশার আলো সমবায় সমিতি লি. এর সভাপতি ও ফ্রেন্ডস ক্লাবের সুহৃদ হাসান মাহমুদ অপু, মো. আলমগীর হোসেন, ফ্রেন্ডস ক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক হালিম সৈকত, অরুণ দাস, ফ্রেন্ডস ক্লাবের সদস্য সাংবাদিক জুয়েল রানা, আল-মামুন, আঃ  কাদির, মো. আরিফ হোসেন ও মো. মুকবুল হোসেন।

 

দারোগা বাড়ি, উত্তর চর্থা
কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ই-মেইল: bdcomillanews24@gmail.com
নিউজ রুম: +8801976530514

প্রধান সম্পাদকঃ হুমায়ূন কবির রনি
নিউজরুম এডিটরঃ তানভীর খন্দকার দীপু
নূরুল আমিন জহির
ই-মেইলঃ editor@comillanews24.com